অনলাইনে ব্রাউজ করতে করতে আমরা প্রায়ই এমন কিছু পণ্য দেখি, যা দেখামাত্রই ভালো লেগে যায়। মনে হয়, "আরে, এটা তো কিনতেই হবে!" আঙুল চলে যায় অর্ডার বাটনে। দুই মিনিট, ব্যস, কেনাকাটা শেষ। অথচ একটু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, জিনিসটা আসলে আমাদের প্রয়োজনই ছিল না!
আসল ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। ঠিক তখনই হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো খরচ বাকি ছিল। ঘরের বাজার, বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিল, ওষুধ কিংবা পরিবারের অন্য কোনো প্রয়োজন। অথচ মুহূর্তের আবেগে অপ্রয়োজনীয় একটি জিনিস কিনে ফেলার পর দেখা যায়, প্রয়োজনীয় জিনিসটি কেনার টাকাটাই আর অবশিষ্ট নেই!
তারপর পার্সেলটা যখন বাসায় এসে পৌঁছায়, কেনার সময়ের সেই উত্তেজনা, আগ্রহ, কিংবা আনন্দ আর থাকে না। বরং অনেক সময় মনে হয়, কেন যে জিনিসটা কিনলাম! শেষ পর্যন্ত সেটার ঠাঁই হয় আলমারির কোনো এক কোণে, যেখানে আগে থেকেই আরও কয়েকটি "দরকারি" জিনিস ধুলো জমাচ্ছে!
অনলাইনে এভাবে হুটহাট, না ভেবে, আবেগের বশবর্তী হয়ে কেনাকাটাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Impulse Buying। বাংলায় বলা যায়, ঝোঁকের বশে কেনাকাটা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আমরা এমনটা করি?
এর কারণ বোকামি নয়, মস্তিষ্কের খেলা।
আমাদের মস্তিষ্ক কোনো কিছু পাওয়ার চেয়ে পাওয়ার অপেক্ষায় বেশি খুশি হয়।
কোনো আকর্ষণীয় পণ্য দেখার পর সেটি পাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, তা আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের প্রত্যাশিত আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে। এর পেছনে কাজ করে ডোপামিন নামের এক খুশির রাসায়নিক বা নিউরোট্রান্সমিটার।
কিন্তু ডোপামিন আসলে বেশি সক্রিয় থাকে চাওয়া আর অপেক্ষার সময়। পণ্যটি কার্টে রাখা, অর্ডার দেওয়া, ডেলিভারির অপেক্ষা, পুরো সময়টাই একটা মিষ্টি নেশা। প্রায় পণ্যটির চেয়ে এই অপেক্ষার উত্তেজনাটাই আমাদের কাছে বেশি দামি হয়ে ওঠে। জিনিসটা হাতে এলেই নেশা শেষ!
এটাই ক্ষণস্থায়ী সুখ।
অনেক সময় আমরা মন খারাপ, একাকিত্ব কিংবা একঘেয়েমি থেকেও কেনাকাটা করি। তখন নতুন কিছু কেনা হয়ে ওঠে সাময়িক মানসিক সান্ত্বনা। মনে হয়, কিছু একটা কিনলে মন ভালো হবে। কিন্তু কেনাকাটার মাধ্যমে যে স্বস্তি পাওয়া যায়, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক। সমস্যাটা থেকে যায়, শুধু কিছুক্ষণের জন্য মন অন্যদিকে সরে যায়।
আর কেনার পর নিজের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য মন নানা গল্প তৈরি করে। "একদিন না একদিন কাজে লাগবেই।" "এত ভালো অফার, না কিনলে তো লস হতো!" অথচ বাস্তবতা হলো, যে জিনিসটি আমাদের প্রয়োজনই ছিল না, সেটি কিনেই তো আসল লসটা হলো!
এবার একটু বৃহত্তর অনলাইন বাস্তবতার দিকে তাকানো যাক। দোষটা কি শুধু আমাদের? পুরোপুরি নয়।
অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের মনস্তত্ত্ব বেশ ভালোভাবেই বোঝে। তারা জানে, কীভাবে মানুষের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে হয়, কীভাবে জরুরিতার অনুভূতি সৃষ্টি করতে হয় এবং কীভাবে মানুষকে দ্রুত কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করতে হয়।
"আর মাত্র ২টি বাকি।" "সেল শেষ হতে বাকি ৩ ঘণ্টা।" "আজই শেষ সুযোগ!" পুরোনো দামের পাশে বড় করে লেখা "৫০% ছাড়"। এসব কৌশল আমাদের মধ্যে একধরনের তাড়াহুড়ো তৈরি করে। মনে হয়, এখনই না কিনলে বিরাট কোনো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে।
মনোবিজ্ঞানে এই সুযোগ হারানোর ভয়কে বলা হয় FOMO (Fear of Missing Out)। অর্থাৎ, কোনো সুযোগ, অভিজ্ঞতা কিংবা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়। এই ভয় আমাদের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত করে। আমরা তখন পণ্যটি আসলেই প্রয়োজন কি না, সেটি না ভেবেই কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। ভয় যখন চেপে বসে, বিচারবুদ্ধি তখন পেছনের সিটে চলে যায়!
অন্যদিকে, মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা ডিজিটাল পেমেন্টের কারণে কেনাকাটাও এখন অনেক সহজ। নগদ টাকা গুনে দিতে হলে হয়তো একবার ভাবতাম, কিন্তু এখন কয়েকটি ক্লিক কিংবা একটি পিন দিয়েই লেনদেন শেষ। টাকা খরচ করার বাস্তব অনুভূতিটাও যেন অনেকটা কমে গেছে।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। আজ অনলাইনে যে পণ্যটি দেখি, কালই সেটির বিজ্ঞাপন বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিরে আসে। আমাদের সার্চ, আগ্রহ এবং অনলাইন আচরণের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। ফলে যে আকাঙ্ক্ষাটি হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে হারিয়ে যেত, সেটিকে বারবার উস্কে দেওয়া হয়।
ওরা আমাদের এতটাই চেনে যে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরাই নিজেদের কম চিনি!
এখানে আরও গভীর একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয় কাজ করে।
আমরা কি জিনিস কিনি, নাকি নিজের একটি সংস্করণ?
আমরা এমন এক ভোগবাদী সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করছি, যেখানে মানুষের চাহিদা কেবল তার প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে না। বরং বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইনফ্লুয়েন্সার এবং অন্যের জীবনযাপনের প্রদর্শনী আমাদের নতুন নতুন চাহিদা তৈরি করে দিচ্ছে।
যেখানে মানুষের পরিচয় অনেক সময় নির্ধারিত হয় সে কী পরে, কী ব্যবহার করে, কোথায় যায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করে, তার উপর।
ফলে আমাদের কেনাকাটা সব সময় প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয় না। অনেক সময় এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আত্মপরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, অন্যের স্বীকৃতি এবং নিজেকে অন্যদের চেয়ে একটু ভালোভাবে উপস্থাপনের আকাঙ্ক্ষা।
আগে আমরা কোনো কিছু কেনার আগে ভাবতাম, 'জিনিসটি আমার কী কাজে লাগবে?' এখন অনেক সময় ভাবি, জিনিসটি আমার থাকলে কেমন দেখাবে! অন্যের কাছে আমাকে কেমন দেখাবে! কিংবা অন্যদের কাছে যা আছে, আমারও কি তা থাকা উচিত নয়?
একটি দামি ঘড়ি কিনলে নিজেকে একটু বেশি সফল মনে হবে। একটি নতুন ফোন কিনলে নিজেকে আধুনিক মনে হবে। ট্রেন্ডিং পোশাক কিংবা ব্র্যান্ডের কোনো পণ্য ব্যবহার করলে হয়তো অন্যের চোখে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
অর্থাৎ, আমরা অনেক ক্ষেত্রে শুধু জিনিস কিনি না, কিনতে চাই নিজের একটি উন্নত সংস্করণ। এমন একটি সংস্করণ, যাকে আমরা নিজের কাছে একটু বেশি আকর্ষণীয় মনে করতে চাই, অন্যের কাছেও।
কিন্তু সেই সংস্করণ কোনো ডেলিভারি ম্যান আমাদের বাসায় পৌঁছে দিতে পারে না!
একটি নতুন পণ্য হয়তো সাময়িক আত্মতৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, কিংবা প্রকৃত সুখের বিকল্প হতে পারে না। অথচ বিজ্ঞাপন ও ভোগবাদী সংস্কৃতি আমাদের বারবার বোঝাতে চায়, আরও কিছু কিনলেই বুঝি আমরা আরও সুখী, আরও সফল, কিংবা আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠব।
এভাবে প্রয়োজনের জায়গা দখল করে নিচ্ছে আকাঙ্ক্ষা। আর আকাঙ্ক্ষার জায়গা দখল করছে তুলনা, প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনেচ্ছা।
সমস্যাটা হলো, তাৎক্ষণিক আনন্দের জন্য আমরা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে বিসর্জন দিই। একটি অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সময় কয়েক মিনিটের আনন্দ হয়তো আমাদের মন ভালো করে দেয়, কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে যে প্রয়োজনীয় কাজটি করা যেত, সেটি আর করা হয় না। অর্থাৎ, আমরা শুধু অপ্রয়োজনীয় জিনিসটি কিনছি না, একই সঙ্গে অন্য একটি প্রয়োজন পূরণের সুযোগও হারাচ্ছি।
কীভাবে এই অভ্যাস থেকে বের হওয়া যায়?
সত্যি কথাটা হলো, মাস শেষে পকেট খালি হলে ক্ষতিটা কোনো অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মের হয় না, আমাদেরই হয়। তাই শুধু বিজ্ঞাপন কিংবা বাজারব্যবস্থাকে দোষারোপ করলে চলবে না। নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে।
এর জন্য অসাধারণ কোনো ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন নেই। বরং কয়েকটি ছোট অভ্যাস আমাদের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
১. আগে প্রয়োজন, পরে শখ।
মাসের শুরুতেই জরুরি খরচের টাকা আলাদা করে রাখুন। বাড়িভাড়া, বাজার, বিল, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য নির্ধারিত অর্থ যেন শখের কেনাকাটায় ব্যয় না হয়ে যায়। শখের কেনাকাটা হবে সামর্থ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর।
২. ২৪ ঘণ্টার নিয়ম অনুসরণ করুন।
কোনো কিছু ভালো লাগলেই সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার করবেন না। কার্টে রেখে দিন। অন্তত ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। পরদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন, "এটা না কিনলে কি সত্যিই আমার কোনো অসুবিধা হবে?" অনেক সময় দেখবেন, কেনার সেই তীব্র ইচ্ছাটাই আর অবশিষ্ট নেই।
৩. টাকার মূল্যকে কাজের সময় দিয়ে হিসাব করুন।
ধরুন, কোনো পণ্যের দাম ৩,০০০ টাকা এবং আপনার প্রতি ঘণ্টার আয় ৩০০ টাকা। তাহলে পণ্যটি কিনতে আপনাকে ১০ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। এবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, ১০ ঘণ্টার শ্রমের বিনিময়ে এই জিনিসটি কি সত্যিই আপনার কাছে এতটা মূল্যবান?
এই হিসাবটি কেনাকাটার সিদ্ধান্তকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করবে।
৪. আবেগের সময় কেনাকাটা এড়িয়ে চলুন।
মন খারাপ, একাকিত্ব, হতাশা কিংবা একঘেয়েমি থেকে কেনাকাটার প্রবণতা তৈরি হলে একটু থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমি কি সত্যিই জিনিসটি চাই, নাকি এই মুহূর্তে আমার মন ভালো করার জন্য কিছু একটা খুঁজছি? প্রয়োজনে হাঁটতে বের হন, বই পড়ুন, কারও সঙ্গে কথা বলুন কিংবা পছন্দের অন্য কোনো কাজে সময় দিন।
৫. বিজ্ঞাপনের তাড়াহুড়োয় সিদ্ধান্ত নেবেন না।
"Limited Time Offer", "Only 2 Left" কিংবা "Last Chance" দেখলেই কেনার প্রয়োজন নেই। মনে রাখবেন, কোনো পণ্য না কিনলে আপনি সব সময় কোনো সুযোগ হারাচ্ছেন না। অনেক সময় না কেনাটাই আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
শখ করে কিছু কেনা দোষের নয়। জীবনে আনন্দেরও প্রয়োজন আছে। নিজের পছন্দের কোনো জিনিস কেনার মধ্যে অপরাধের কিছু নেই। সমস্যা তখনই, যখন আমরা প্রয়োজন না বুঝে, সামর্থ্য না ভেবে, মুহূর্তের আবেগে কেনাকাটা করি এবং পরে অনুশোচনা করি।
মনে রাখা দরকার, কোনো কিছু কেনার সামর্থ্য থাকা আর সেটি কেনার প্রয়োজন হওয়া এক বিষয় নয়। আমাদের প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই।
ক্ষণস্থায়ী সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা যেন দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি হারিয়ে না ফেলি। কারণ, জীবনে কত কিছু কিনলাম, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতটা সচেতনভাবে নিজের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য করতে শিখলাম।
সব ভালো লাগার জিনিস আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় নয়। আবার সব প্রয়োজনীয় জিনিস যে আমাদের ভালো লাগবে, তাও নয়। বিদ্যুৎ বিল দেখে কার কবে মন ভালো হয়েছে?
তাই পরেরবার অর্ডার বাটনে আঙুল যাওয়ার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন। কী কিনছি, সেটা নয়। কেন কিনছি?
- সাইফ সামির
৫ নভেম্বর ২০২৬